ইকো রিপোর্ট বোঝার উপায় বিস্তারিত

ইকো টেস্ট বা ইকোকার্ডিওগ্রাম হল হৃদপিণ্ড সংশ্লিষ্ট অস্বাভাবিকতা নির্ণয় করার জন্য একটি কার্যকর মেডিকেল পরীক্ষা। ইকো টেস্টে আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের ছবি তৈরি করে এর গঠন ও কার্যকারিতা নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রে আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ বা অতি দ্রুত গতির শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন অংশ দেখা হয়। আজকের প্রবন্ধে ইকোকার্ডিওগ্রাফী সংক্রান্ত জরুরি সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। এর পাশাপাশি ইকো রিপোর্ট বোঝার উপায় সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে পারবেন এই আলোচনায়।

ইকো টেস্ট কীভাবে করা হয়?

ট্রান্স থোরাসিক ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাফীতে বুকের উপর একটি প্রোব রাখা হয় যা দিয়ে বুকের ভেতর আল্ট্রাসাউন্ড শব্দ তরঙ্গ প্রেরণ করা হয়। এরপর উক্ত তরঙ্গ হার্টের ভেতর প্রতিফলিত হয়ে পুনরায় প্রোবে ফিরে আসে। এই প্রতিফলিত শব্দ তরঙ্গকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে কম্পিউটার এর মাধ্যমে হার্টের প্রতিবিম্ব তৈরি করা হয়। যা ইকো রিপোর্ট হিসেবে প্রকাশ করা হয়। ইকো টেস্ট একটি নন-ইনভেসিভ পরীক্ষা যার অর্থ হল এই টেস্ট করানোর জন্য শরীরের ভেতর যন্ত্রের কোনো অংশ প্রবেশ করাতে হয়না। এছাড়া কালার ডপলার ইকোকার্ডিওগ্রাফীতে বুকের ভিতরের রক্তনালি ও রক্ত প্রবাহের ধরন পরীক্ষা করা হয়।

ইকো রিপোর্ট বোঝার উপায়

ইকো টেস্ট কেন করতে হয়?

যেসব কারণে ইকো টেস্ট করাতে হয় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো-

হার্টের কার্যকারিতার নির্ণয়

ইকোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদপিন্ডের সামগ্রিক কার্যকারিতা নির্ণয় করা হয়। তাই রোগীর হৃদপিণ্ডের পাম্পিং শক্তি, ওয়াল মুভমেন্ট পরীক্ষা করার প্রয়োজন হলে ইকো টেস্ট করতে হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে বিশদভাবে হার্ট এর রক্ত ​​পাম্প করার ক্ষমতা ও অন্যান্য অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা হয়।

হার্টের ভালভের কার্যকারিতার নির্ণয়

ইকো টেস্ট করে হার্টের ভালভের অবস্থা এবং কার্যক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ভালভের স্টেনোসিস বা সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া অথবা রিগারজিটেশন যেখানে ভালভ সম্পূর্ণ বন্ধ না হওয়ায় লিকেজ দেখা যায় তা শনাক্ত করা যায়।

হার্টের গঠনগত অস্বাভাবিকতা নির্ণয়ঃ ইকো পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন গঠনগত অস্বাভাবিকতা নির্ণয় করা হয়। যেমনঃ হার্টের প্রকোষ্ঠের আকার বা হার্টে কোনো টিউমার আছে কিনা তা শনাক্ত করতে সাহায্য করে এই ইকো টেস্ট।

হার্টের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা

হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির নিয়মিত ইকোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হয়। এর মাধ্যমে চিকিৎসার কার্যকারিতা ও অগ্রগতি নির্ণয় করা হয়। সামগ্রিকভাবে হার্টের অবস্থা বোঝার জন্যেও এই টেস্ট করানোর প্রয়োজন হতে পারে।

বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট নির্ণয়ঃ কোনো ব্যক্তির বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দিলে ইকোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষা করে হৃদপিণ্ড সংক্রান্ত কোন সমস্যা আছে কিনা তা নির্ণয় করা হয়। ইকো টেস্ট এর মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের গঠন এবং কার্যকারিতা স্বাভাবিক আছে কিনা তা বোঝা যায়।

জন্মগত হৃদরোগ নির্ণয়

হৃদপিণ্ডে কোনো জন্মগত ত্রুটি থাকলে তা ইকো টেস্ট এর মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। যেমনঃ কারও হৃদপিণ্ডে ছিদ্র থাকলে তা ইকো পরীক্ষা করে বের করা যায়।

ইকো টেস্ট করানোর নিয়মাবলি

  • ইকো পরীক্ষা করানোর জন্য বিশেষ কোনো পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। তবে TTE বা ট্রান্স থোরাসিক ইকোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষার ক্ষেত্রে ৪-৬ আগে থেকে না খেয়ে থাকতে হয়।
  • পুরো পরীক্ষা সম্পন্ন হতে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে। পরীক্ষার সময় আপনাকে বাম দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকতে হবে।
  • হৃদপিণ্ডের গতি ও ছন্দ দেখার জন্য বুকে তিনটি ইসিজি লিড লাগানো হয়। এরপরে বুকে, গলায় ও উপরের পেটে এক ধরনের জেলি লাগিয়ে তাতে প্রোব বসানো হয়।
  • একজন ইকোকার্ডিওলজিস্ট এসব প্রোবের মাধ্যমে ভিডিও মনিটরে হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন অংশের ছবি আনবেন।
  • পরীক্ষা শেষে আপনার বুকে লাগানো জেলি টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে দেয়া হবে।

ইকো রিপোর্ট বোঝার উপায়

ইকোকার্ডিওগ্রাম বা ইকো পরীক্ষায় প্রতিধ্বনি চলাকালীন সময়ে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের সাথে সাথে ছোট ছোট ভিডিও রেকর্ড করা হয়। এই ভিডিও থেকেই ইকো রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয় যার মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের গঠন এবং কার্যকারিতা সম্পর্কে তথ্য জানা যায়।

ইকো রিপোর্টে সাধারণত যেসব তথ্য থাকে তা হলঃ

Ejection Fraction / ইজেকশন ভগ্নাংশ-  এই পরিমাপ দিয়ে আপনার হৃদপিণ্ড প্রতিবার সংকোচনে প্রতি প্রকোষ্ঠ থেকে কী পরিমাণ রক্ত নির্গত করে তা বোঝায়। Ejection Fraction এর মান ৫৫% এর বেশি হলে তা স্বাভাবিক হৃদপিণ্ডকে নির্দেশ করে। এর মান যত কম হয় হৃদপিণ্ডের অকেজো হবার সম্ভাবনা তত বেশি হবে।

স্বাভাবিক EF এর মান প্রায় 55-65 শতাংশ হয়ে থাকে। Ejection Fraction এর পরিমাপ দ্বারা আপনার হৃদপিণ্ড কতটা ভালোভাবে পাম্প করছে ডাক্তার সেটি বুঝতে পারবেন। এর মান ৪০ শতাংশের নিচে হলে বুঝতে হবে যে হৃদপিণ্ড যেভাবে পাম্পিং করা উচিত সেভাবে কাজ করতে পারছে না। হচ্ছে না। EF ৪০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে তা কখনও কখনও হার্ট ফেইলিওর হিসাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসক প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং পেসমেকার বা আইসিডি (ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভারটার ডিফিব্রিলেটর) এর পরামর্শ দিবেন।

LV Cavity Size/ ডায়াস্টোলিক ডায়ামিটার– বাম ভেন্ট্রিকল হল হৃদপিণ্ডের প্রধান পাম্পিং প্রকোষ্ঠ। এটি হৃদপিণ্ডের চারটি প্রকোষ্ঠের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে পেশীবহুল।  ইকো রিপোর্টে LV Cavity Size এর ক্ষেত্রে Normal অথবা Dilated লেখা থাকবে। প্রকোষ্ঠ dilated হয়ে যাওয়া বলতে বোঝায় এটি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং অক্সিজেনযুক্ত রক্ত স্বাভাবিকভাবে সারা দেহে পাম্প করতে পারছেনা।  পুরুষদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক LV সাইজ হল ৪২ থেকে ৫৯ মিমি এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৩৯ থেকে ৫৩ মিমি। Mildly dilated LV সাইজ পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৬৩ মিমি এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৫৪ থেকে ৫৭ মিমি। Moderately dilated LV সাইজ পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৬৪-৬৮ মিমি এবং ৫৮-৬১ মিমি। পুরুষদের ক্ষেত্রে এর মান ৬৯ মিমি এর বেশি হলে severly dilated এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৬২ মিমি এর বেশি হলে severely dilated.

Regional Wall Motion Abnormality (RWMA)- এর দ্বারা বোঝায় হৃদপেশির কোনো অংশ স্বাভাবিকভাবে সংকুচিত হচ্ছেনা। এক্ষেত্রে রিপোর্টে Present অথবা Absent লেখা থাকবে। Absent মানে হল আপনার হৃদপিণ্ড সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছে।

Left Ventricular Posterior Wall end diastole (LVPWd) and Left ventricular posterior wall end systole (LVPWs)- এর স্বাভাবিক মান ০.৬ সেমি থেকে ১.১ সেমি।

LA Diameter – এটি হল বাম অ্যাট্রিয়ামের ব্যাসের পরিমাপ। এর স্বাভাবিক মান হল ২ থেকে ৪ সেমি এর মধ্যে।

Interventricular Septum (IVS) – এর স্বাভাবিক মান হল ০.৬ সেমি থেকে ১ সেমি এর মধ্যে।

Valve- হৃদপিণ্ডে ৪টি valve রয়েছে । যথাঃ aortic, mitral, pulmonic, tricuspid valves. ইকো রিপোর্ট এর মাধ্যমে এদের অবস্থা ও কার্যক্ষমতা বোঝা যায়। Valve Stenosis এমন একটি অবস্থা যখন valve সরু হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক রক্ত চলাচল বাধা দেয়। আর Regurgitation এর ক্ষেত্রে রক্ত লিকেজ এর মাধ্যমে পিছনের দিকে ফিরে আসে।

আপনার জন্য আরো থাকছে –

ইকোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষার সম্ভাব্য ঝুঁকি

ইকো একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ পরীক্ষা। আল্ট্রাসাউন্ড পদ্ধতি ব্যবহার করায় এখানে কোনো রকম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রেও ইকো পরীক্ষার কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। ইকো পরীক্ষা করানোর সময় অনেক ক্ষেত্রে প্রোবের চাপে বুকে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনার ইকোকার্ডিওলজিস্টকে অবহিত করুন।

শেষ কথা

একটি কর্মক্ষম হৃদপিণ্ড আপনাকে একটি সুস্থ জীবনযাপনে সহায়তা করবে। এজন্য হৃদপিণ্ডের সুস্থতা নিশ্চিত করতে সবার সচেতন হতে হবে। নিয়মমাফিক জীবনযাপন করতে হবে, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও ধূমপান, মদ্যপান থেকে বিরত থাকতে হবে। এছাড়া বুকে ব্যথার মত উপসর্গ বা হৃদপিণ্ডের কোনো রকম অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিৎসক ইকো পরীক্ষা করাতে দিলে আজকের ইকো রিপোর্ট বোঝার উপায় থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের আলোকে সহজেই একটি প্রাথমিক ধারণা করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে ঘরে বসে থাকবেন না, অবশ্যই রিপোর্ট নিয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

Similar Posts

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *